কুড়িগ্রামের উলিপুরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্যসেবা এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। কেন্দ্রগুলোতে নেই কোনো চিকিৎসক, নেই কোনো ওষুধপত্র। উপজেলার ৯টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মধ্যে ৮টিই চলছে কেবল পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের মৌখিক পরামর্শ দিয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সরকারি ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় চরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষসহ গ্রামীণ জনপদ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে এবং নাগরিকরা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, দৃশ্যত কোনো কাজ না করেই বছরের পর বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি বেতন-ভাতার সুবিধা ভোগ করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদী বেষ্টিত বজরা, থেতরাই, গুনাইগাছ এবং ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত হাতিয়া, বুড়াবুড়ি, সাহেবের আলগাসহ ধরনীবাড়ী, তবকপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ১টি করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে।মেডিকেল অফিসার: ৯টি কেন্দ্রে ১ জন করে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও, বর্তমানে শুধু বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে ১ জন কর্মরত আছেন। বাকি ৮টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ চিকিৎসক শূন্য। মাঠ পর্যায়ের কর্মী: মাঠ পর্যায়ে ৭৫ জন সহকারী পরিদর্শিকার বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৩ জন। ৩২টি পদই শূন্য।
সরেজমিন উপজেলার থেতরাই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা নদীর চরাঞ্চল থেকে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে বেশ কয়েকজন নারী সেবা নিতে এসেছেন। দায়িত্বরত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা কহিনুর বেগম রোগীদের সমস্যা শুনে শুধু মৌখিক পরামর্শ দিয়ে বিদায় করে দিচ্ছেন।
সেবা নিতে আসা রোজিনা খাতুন (৩২), রোকছানা বেগম (৪৮), মমতাজ বেগম (৩৩) ও কহিনুর বেগম (৩৬) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চরের দীর্ঘ পথ হেঁটে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসে দেখি এখানে কোনো ডাক্তার নেই। একজন আপা সব সমস্যা শুনে শুধু মুখে মুখে পরামর্শ দিলেন। এই পরামর্শ দিয়ে আমাদের কী হবে? আমাদের প্রয়োজন ওষুধ, কিন্তু তা এখানে নেই। আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ, সরকারের দেওয়া ওষুধ পেলে আমাদের উপকার হতো। অথচ এখানে এসে কাজের কাজ কিছুই হলো না, শুধু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা-যাওয়াই বৃথা গেল।
দায়িত্বরত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা কহিনুর বেগম নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, "প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০-৫০ জন শিশু ও নারী সেবা নিতে আসেন। আমার একার পক্ষে এতো লোকের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। আগত রোগীদের শুধুমাত্র পরামর্শ দেওয়া ছাড়া ওষুধ দিতে পারি না। এই কারণে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ধরনের কটু কথা শুনতে হয়। গ্রামীণ অসহায় মানুষগুলোর জন্য ওষুধ ও একজন চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা হলে সেবার মান বৃদ্ধি পেত।
উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা (রেজাউল করিম):
তিনি কেন্দ্রগুলোতে ওষুধ না থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে নতুন কোনো বরাদ্দ না থাকায় ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া শূন্য পদে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের চাহিদাপত্র জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সব সমস্যার সমাধান হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (মোজাম্মেল হক) মাঠ পর্যায়ে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ওষুধ কেনাকাটা ও সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে এই সাময়িক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেছে। আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে আমাদের কর্মীরা এখনো গ্রাম পর্যায়ে গর্ভকালীন মাতৃসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (এ.টি.এম আরিফ) তিনি জানান, এই সংকটের বিষয়টি তাকে আগে জানানো হয়নি। তিনি বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর এই সমস্যা সম্পর্কে আমাকে আগে অবগত করা হয়নি। আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে আমাদের বিষয়গুলো জানালে আমরা দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সমস্যা সমাধানের জন্য লিখিতভাবে জানাব।